তাজহাট জমিদার বাড়ি,রংপুর।শিলালিপি
থেকে জানা যায়, প্রাসাদটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা কুমার গোপাল
লাল রায় (জি.এল রায়) নির্মাণ করেন। এতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর।
মহারাজা গোপাল লাল রায় পেশায় ছিলেন একজন স্বর্ণকার। যার নামে বর্তমানে
রংপুরে একটি সড়ক আছে (জি. এল রায় রোড)। মূলত, এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন
মান্না লাল রায়। যিনি সুদূর পাঞ্জাব থেকে রংপুরের প্রসিদ্ধ মাহিগঞ্জে
স্বর্ণ ব্যবসার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। কথিত আছে, তিনি স্বর্ণখচিত মুকুট বা
তাজ বিক্রি করতেন। তার মনমুগ্ধকর এই তাজ বা মুকুট এখানকার হাটে বিক্রি
করতেন। ফলে, এ এলাকাটি তাজহাট নামে পরিচিতি পেয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাস ১৯৮৪
থেকে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রাসাদটি ব্যবহৃত হয় রংপুর হাইকোর্ট,
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একটি শাখা বা বেঞ্চ হিসেবে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট
এরশাদ বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা সদরে
বাংলাদেশের হাই কোর্ট বিভাগের আঞ্চলিক বেঞ্চ স্থাপন করেন, যার একটি রংপুরে
স্থাপিত হয়েছিল। পরে, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর
এই পদ্ধতি তুলে দেওয়া হয়। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ
সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে একটি সংরক্ষিত স্থাপনা তথা
স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকার এ স্থাপত্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অনুধাবন করে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর জাদুঘরকে স্থানান্তর করে এ প্রাসাদের
দ্বিতীয় তলায় নিয়ে আসে। মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে
জাদুঘরে উঠলেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ। যাতে রয়েছে দশম ও একাদশ
শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত এবং আরবি ভাষায় লেখা
বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে রয়েছে মুঘল
সম্রাট আওরাঙ্গজেবের সময়ের কুরআনসহ মহাভারত ওরামায়ণ। পেছনের ঘরে রয়েছে
বেশ কয়েকটা কালো পাথরের হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি। কিন্তু জাদুঘরের
ভেতরে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যেমন দেখতে মূল
প্রাসাদ চত্বরে রয়েছে বিশাল খালি মাঠ, গাছের সারি এবং প্রাসাদের দুই পাশে
রয়েছে দুটি পুকুর। প্রাসাদটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চার তলার
সমান উঁচু। এর গঠনশৈলী প্রাচীন মুঘল স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে করা
হয় যার প্রমাণ মেলে মধ্যভাগে বিশাল একটি গম্বুজ ও দুই পাশে তার ছড়িয়ে
যাওয়া দালানগুলোর একটা মসজিদের অবয়ব থেকে। তবে রাজবাড়ি যেই দিক থেকে
বাংলাদেশের অন্য সকল প্রাসাদের থেকে আলাদা তা হল এর সিঁড়িগুলো। সর্বমোট
৩১ টি সিড়ি আছে যার প্রতিটিই ইতালীয় ঘরানার মার্বেল পাথরে তৈরি। সিঁড়ি
থেকে উঠে জাদুঘর পর্যন্ত মেঝের পুরোটাও একই পাথরে তৈরি। রাজবাড়ির
পশ্চাৎভাগে গুপ্ত সিঁড়ি রয়েছে। এই গুপ্ত সিঁড়ি কোনো একটি সুড়ংগের সঙ্গে
যুক্ত যা সরাসরি ঘাঘট নদীর সঙ্গে যুক্ত এমন একটা জনশ্রুতি রযেছে। তবে
সিঁড়িটি এখন নিরাপত্তা জনিত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাসাদের
সুন্দর ফোয়ারাটি কালের বিবর্তনে শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশা
কিছুটা মলিন হলেও এখনো এর জৌলুশ বোঝা যায়। কথিত আছে রানীর জন্যেই বিশেষ
করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাসাদটির সম্মুখভাগ প্রায় ৭৬ মিটার, দুই তলা বিশিষ্ট এবং পূর্ব দিকে মুখ করে এর অবস্থান। প্রাসাদটির
মাঝখানে একটি আকর্ষণীয় প্রশস্ত সিঁড়ি রয়েছে যা আমদানি করা সাদা মার্বেল
দিয়ে তৈরি। সিঁড়ি টি বারান্দা থেকে সরাসরি ওপরের তলায় নিয়ে যায়। গঠনশৈলী প্রাসাদটি
ছাদের মাঝখানে একটি লম্বা অষ্টভুজাকার ঘাড়সহ একটি পাঁজর-শঙ্কুযুক্ত
গম্বুজ দ্বারা সাজানো, আংশিকভাবে সরু আধা-সরু স্তম্ভগুলির একটি সারি রয়েছে
যা প্রাসাদটিকে দৃঢ়তা প্রদান করে। মনোরম সিঁড়ির উভয়
পার্শ্বের রেলিংগুলো মূলত ইতালীয় মার্বেল পাথরের এবং ধ্রুপদী রোমান
সম্রাজের মূর্তিগুলোর বিভিন্ন ভাস্কর্য দিয়ে অলঙ্কৃত ছিল, কিন্তু এখন
সেগুলো কালের পরিক্রমায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। প্রাসাদটির
সামনের মুখের প্রতিটি প্রান্তে দুটি করে অর্ধ-অষ্টভুজাকার এবং একটি
কেন্দ্রীয় সাজানো বারান্দা রয়েছে। বারান্দার ওপরের ছাউনি টি গোলাকার
খাদযুক্ত চারটি সুন্দর সরু স্তম্ভের ওপর বহন করা হয়, যখন বিল্ডিংয়ের
প্রতিটি সাজানো প্রান্তে দুটি অনুরূপ স্তম্ভ, একটি ত্রিভুজাকার ধার দৃঢ়তা
প্রদান করে। প্রাসাদটির খোলা প্রান্ত হতে পশ্চিম
প্রান্ত পর্যন্ত U আকৃতির মতো করে নকশা তৈরি করে। প্রবেশ পথের বাইরে নিচ
তলায় একটি খুব বড় হল আছে। একটি চওড়া গলির ভেতরের ব্লকের পুরো দৈর্ঘ্য
দিয়ে চলে যায়। দুটি প্রশস্ত কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় ওঠার জন্য
ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাসাদটিতে দুটি তলায় প্রায় ২২ টির মতো কামরা রয়েছে। জমিদারি
প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগেই। হাঁক-ডাক ফরমায়েশ। এস্টেটের ভেতর নির্যাতন
সব থেমে গেছে। শুধু ইতিহাস, কালের সাক্ষী হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়ি। যেভাবে যাওয়া যায় ঢাকা
থেকে রংপুর যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবহন হলো গ্রিন লাইন এবং টি আর
ট্রাভেলস। এছাড়া এ রুটে আগমনী পরিবহন, এস আর, শ্যামলী, হানিফ, কেয়া ইত্যাদি
পরিবহনের সাধারণ বাস চলাচল করে। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে প্রতিদিন
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ছাড়ে এসব বাস। টিকিট কেটে চেপে বসলেই
হলো। রংপুর পৌঁছে কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড বা কেন্দ্রীয়
বাস টার্মিনালে নেমে সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা করে ঘুরে আসা যাবে
তাজহাট জমিদার বাড়ি থেকে। হানিফ বা শ্যামলীতে গেলে মর্ডান মোড় নেমে সেখান
থেকেও যাওয়া যাবে। জাদুঘরে নির্দিষ্ট প্রবেশ মূল্য পরিশোধ করে প্রবেশ করা
যায়। প্রাসাদ চত্ত্বরে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে চাইলে গাড়ির জন্যও নির্দিষ্ট ফি
দিতে হবে
0 মন্তব্যসমূহ